শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৩:৩৪ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, একুশের কণ্ঠ:: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। আলাদা ব্যালটে ভোটারদের সামনে চারটি সংক্ষিপ্ত বিষয়ের ভিত্তিতে একটি প্রশ্ন রাখা হবে-জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে তারা ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’ ভোট দেবেন। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে দেশের সংবিধান ও রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় ধরনের সংস্কার কার্যকর হবে।
গত কয়েকদিন ধরে অন্তর্বর্তী সরকার গণভোট নিয়ে দেশব্যাপী প্রচারণা চালাচ্ছে। শুরুতে নিরপেক্ষ অবস্থান থাকলেও পরে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা শুরু করে সরকার। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এতে বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথ খুলবে।
সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার পর জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার এবং বাকি ৩৭টি আইন, অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন প্রস্তাবে বিএনপি ও জামায়াতসহ কয়েকটি দলের নোট অব ডিসেন্ট থাকায় শেষ পর্যন্ত সরকার গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয়।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদ ২৭০ দিনের মধ্যে এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। তা না হলে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সংবিধান সংশোধনী বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হয়েছে বলে গণ্য হবে। আর ‘না’ জয়ী হলে পুরো জুলাই সনদই কার্যকর হবে না।
ভাষা, জাতি ও মৌলিক পরিবর্তন
জুলাই সনদ অনুযায়ী বাংলা রাষ্ট্রভাষা থাকলেও অন্যান্য মাতৃভাষার স্বীকৃতি যুক্ত হবে। নাগরিকদের পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’, বাঙালি নয়। সংবিধানের মূলনীতি বদলে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি যুক্ত হবে।
বর্তমানে ২২টি মৌলিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত হবে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবহার ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অধিকার। সংবিধানের কিছু মৌলিক অনুচ্ছেদ পরিবর্তনে গণভোট বাধ্যতামূলক করা হবে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য
জরুরি অবস্থা জারিতে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা থাকছে না; মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং বিরোধী দলের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হবে। জরুরি অবস্থাতেও মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না।
রাষ্ট্রপতি গোপন ব্যালটে সংসদের উভয় কক্ষের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন। প্রধানমন্ত্রী এক জীবনে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের বেশি থাকতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের ক্ষেত্রেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সম্মতি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
সংসদ ও নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার
সংসদ দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট হবে—১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে ভোটের আনুপাতিক হারে। নারীদের সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে ধাপে ধাপে ১০০ করার প্রস্তাব রয়েছে। ডেপুটি স্পিকার আসবেন বিরোধী দল থেকে।
বাজেট ও আস্থাভোট ছাড়া অন্য বিষয়ে এমপিরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনে সংসদের উভয় কক্ষের সম্মতি লাগবে।
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হবে এবং নির্বাচন কমিশন গঠনে বিরোধী দলের ভূমিকা বাড়ানো হবে।
বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন
প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে আপিল বিভাগ থেকে। বিচারক নিয়োগ ও সংখ্যা নির্ধারণে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের ভূমিকা থাকবে। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।
ন্যায়পাল, দুদক, পিএসসি, মহা হিসাব নিরীক্ষকসহ সাংবিধানিক পদগুলো নিয়োগে বিরোধী দল অন্তর্ভুক্ত সার্চ কমিটির কথা বলা হয়েছে।
আইন ও প্রশাসনিক সংস্কার
৩৭টি সংস্কার বাস্তবায়ন হবে আইন ও অধ্যাদেশের মাধ্যমে। এর মধ্যে রয়েছে বিচার বিভাগ ডিজিটালাইজেশন, স্বতন্ত্র তদন্ত সার্ভিস, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন বিভাজন এবং কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি নতুন বিভাগ গঠন।
তবে গণভোটের ব্যালটে এসব বিশদ বিষয় উল্লেখ থাকবে না। সেখানে মাত্র চারটি সংক্ষিপ্ত পয়েন্টের ভিত্তিতে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সংবিধানে সবচেয়ে বড় সংস্কারের দ্বার খুলতে যাচ্ছে। সিদ্ধান্তটি এখন ভোটারদের হাতে।